×
  • নজরে
  • ছবি
  • ভিডিও
  • আমরা

  • বাংলার ত্রস্ত নীলিমার ভয়াল সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে

    4thPillars ব্যুরো | 26-03-2020

    শুভদীপ মৈত্র

    আর্ট আসলে সমাবেশের বস্তু নয়/ বরং একা ঘরে বসে নিজের ভেতরে/ কুয়ো খোঁড়ার মতো/ একটা অনিবার্য আত্মহননের কাজ/ নিজের অস্তিত্বের সেই সংকটকে/ লোকের সামনে/ ঠিক হাততালি পাওয়ার জন্য খুলে দেওয়া হয় না। -এ কথাগুলোই লেখা হয়েছে একটি বইয়ের ব্লার্ব-এ । বইটির নাম- বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়। লিখেছেন কণিষ্ক ভট্টাচার্য। বইটি পড়লেন শুভদীপ মৈত্র

     

    বাংলার ত্রস্ত নীলিমার ভয়াল সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে

    বাংলার ত্রস্ত নীলিমায় আবার দাঁড়াতে হবে কে ভেবেছিল? সেই নীলিমায় দাঁড়িয়ে যখন পায়ের তলার মাটি অহরহ কেঁপে উঠছে, তখন সেই অবস্থার সাহিত্যিক বয়ান কি এবং কীভাবে সম্ভব, এ প্রশ্নের উত্তর কণিষ্ক ভট্টাচার্যর বইয়ের পরতে পরতে মিলবেরবি ঠাকুর বলেছিলেন নামকে যারা নামমাত্র মনে করে আমি তাদের দলের নই – এই কথাটা কী নিদারুণ সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে, এবং এই যে গল্পের বইটি ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়’, যার নামকরণ একই সঙ্গে সমসময়ের এবং আরেক সময়ের আরেকটি বইয়ের হতে-পারত-নামের সময়ের অনুরণন নিয়ে হাজির হচ্ছে – যা অন্য সময়ে হলে মনে হতে পারত নেহাত আলঙ্কারিক – এখন একটা ভয়ঙ্কর অভিঘাত তৈরি করছে। এবং তা ব্যক্তি পাঠকের অনুভবের বিষয়, তবু সমালোচনা করতে গেলে যে কয়টা ‘ধরা যাক ইঁদুর এবার’ লাগে, তার চেষ্টা করছি। কারণ এও এক রূপসী বাংলা। না, কোনো উচ্ছ্বাস থেকে বলা নয় এই কথাটা, এই বইয়ে প্রত্যেকটা গল্প আস্তে আস্তে আমাদের সামনে পেঁয়াজের খোসার মতো ছাড়িয়ে মেলে ধরছে একটা বাংলাকে যা এই সময়ের, এই মুহূর্তের – আবার শাশ্বতও

    পাঠক, প্রথম গল্প থেকেই দেখতে পাবেন একটা জনপদে অন্ধকার নামছে – নামহীন জনপদ, আমরা সেই গল্পের শেষে গিয়ে দেখব অন্ধকার ঘনীভূত হচ্ছে এবং বহু গবেষণা, উপায়, তত্ত্ব জিজ্ঞাসার পরও যেটা সত্যি, তা হল অন্ধকার। এই গল্প যেন একটা ভূমিকা, যা তৈরি করে দিচ্ছে সেই ত্রস্ত আবহাওয়া, যা বইটা জুড়ে জাঁকিয়ে বসবে। এই ত্রস্ত অবস্থা প্রত্যেকটা গল্পের শরীরের মধ্যে কোথাও না কোথাও রয়ে যাচ্ছে – বোদলেয়রের ভাষায়- আ স্টেট অফ কনভালশান, প্রত্যেক চরিত্র যেন মুর্ছোত্থিত অবস্থায় আবিষ্কার করছে নিজেকে তার পারিপার্শ্বিকে।

    অন্ধকার সংঘারামে, বাংলার ত্রস্ত নীলিমায়, দেবতা বা শঙ্কর কবিচন্দ্র বা রামকৃষ্ণ রায় যে আখ্যান লেখেনি গল্পগুলিতে, আমরা দেখতে পাই  গ্রাম ও মফস্বল – কথকের বুননে তার বদলে যেতে থাকা চেহারার আন্দাজ পাইহ্যাঁ, কোনো নিরীহ সৌন্দর্য নেই তার মধ্যে, বরং যা রয়েছে ওই থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো ত্রাস – অথচ যেখানে হাবা-র মতো, ছেঁকামতীর মতো জাদুকর হরমোহনের মতো ইপিলবুড়ার মতো মানুষ ছিল, আছে এবং প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্যের মধ্যে তাদের অসহায়তা, তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলোয় নিঃস্পৃহ; আর তাই একটা ভয়াবহ অনুভূতিমালা একটা বিশাল ট্র্যাজেডি তৈরি করছে। ঠিক একইভাবে আমরা অন্য গল্পগুলোয় ঢুকে যাই শহর কলকাতার অলিতে গলিতে – অনেকাংশে উত্তর কলকাতা যা কী আশ্চর্য এখনো জীবিত হালের চলচ্চিত্রে দেখা মিউজিয়াম নয় – এবং কতদিন পর সেই অলিগলির মানুষগুলোকে দেখতে পাই আমরা, কেমন আছে তারা,  কীভাবে চলমান ঐতিহ্যিক যাপনের সঙ্গে নব্বই পরবর্তী তথাকথিত বিশ্বায়নের দ্বন্দ্ব বদলাচ্ছে তাদের জীবন বা পাশে ফেলে দিয়ে চলে যাচ্ছে যেন ফেলা শালপাতা।

     

    •  শিল্পকে শেষ পর্যন্ত সময়ের দলিল হয়ে ওঠা ছাড়িয়ে আরো একটা ভিন্নতর অন্বেষণে যেতে হয়।
    • আধুনিক কবিতায় বেহুলাকে মান্দাসে ভাসালে তা জাদু বাস্তব নয় আবার ইতিহাসও নয়। তা আসলে অতীত ইতিহাস থেকে চোলাই করা অনুভূতির নান্দনিক নির্যাস যার দায় আছে শুধুমাত্র সমসময়ের অবয়বকে প্রাণ দেওয়ার।                  
    • এই প্রচেষ্টার বাইরে মিথ নিয়ে গল্প ফেঁদে অধুনা কারবারিরা তাকে শুধুমাত্র ইতিহাস বলে চালাতে বা তাকে তথ্য হিসেবে চালাতে যাওয়ার ছেলেমানুষিতে মেতেছেন – এই বইটিতে সেই জোর জবরদস্তি নেই।
    • প্রত্যেকটা গল্পের শরীরের মধ্যে কোথাও না কোথাও রয়ে যাচ্ছে – বোদলেয়রের ভাষায়- আ স্টেট অফ কনভালশান, প্রত্যেক চরিত্র যেন মুর্ছোত্থিত অবস্থায় আবিষ্কার করছে নিজেকে তার পারিপার্শ্বিকে।

     

    ঐ যে মুর্ছোত্থিত অবস্থা তার পিছনের কারণ – দ্বন্দ্বসে গ্রাম, মফস্বল, শহর কলকাতা যাই হোক না কেন – তার প্রতিটা গল্পের ভিতর দেখতে পাই একটা অন্ধ, অজানা সংঘর্ষ চলেছে – নানা অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থার লড়াইয়ের যেন একটা জীবন্ত সুবিশাল ল্যাবরেটরি, যাতে ফেলে সময় দেখছে সবাইকে। ইথারাইজড, মৃতবৎ প্রত্যেকে ব্যবচ্ছেদের টেবিলে। মজা এটাই যে, একে শুধুমাত্র এই সময়ের দায় হিসেবে দেখাননি লেখক, কেন না ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ নামের একটা গল্প জুড়ে দিয়েছে বাংলার ইতিহাসকে – গল্পের চরিত্র রামমোহনকে আমরা দেখতে পাই ঠিক এমনই একটা সময়ে যা ওই ত্রস্ত অবস্থা, শেষ রাতের ভয়াবহ অন্ধকারে – অর্থাৎ একটা বৃত্তের মতো ফিরে আসে ইতিহাস, হিস্টরি রিপিটস ইটসসেলফ্।   

    এই বইয়ের প্রতিটা গল্পের কথন ভঙ্গিমা সচকিত করতে পারে নিবিড় কোনো পাঠককে, সমালোচক হিসেবে সেইদিকে নজরটানা আমার কাজ যদিও এ একধরনের “স্পয়লার’ বটে, কারণ এটা শৈলীর ব্যাপার। কথকের একটা নিজস্ব ভঙ্গিমা রয়েছে যা বাংলা গল্পে নতুন না হলেও অধুনা বিরল – এই কথক গল্প বলাটাকে শুধুমাত্র তথ্য এবং ঘটনা পরম্পরার অবজেক্টিভিটি দিয়ে দূরত্ব বজায় রাখে না, বরং তার স্বরের মধ্যে আবেগ খেলেকয়েকটা উদাহরণের লোভ সামলাতে পারছি না, এই যেমন ধরুন- উজ্জ্বল নীলমণি গল্পে ‘ছেলের পিঠে হকিস্টিকের রক্তাভ নদীর পাশফেরা দেখে কত লড়াইয়ের লোক বসুদেব একমাত্র ছেলে অচ্যুতকে কোলকাতায় পাঠিয়ে দেয়’ এখানে রক্তাভ নদীর পাশ ফেরা-র মতো উপমা ব্যবহার করে আবেগ তৈরি করছেন কথক এবং একই বাক্য বলে দিচ্ছে অচ্যুতের বাবার সে সম্পর্কে ধারণা ও অভিজ্ঞতা কী। এই সংকোচন শৈলী হিসেবে কবিতার এবং এটা তথ্যভিত্তিক গল্প বলা ও প্লটের গঠনের নিয়ম থেকে সরে এসে উপমার মাধ্যমে প্রকাশ করে কথনকে

    তারপর ধরুন ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমায় গল্প’টার শুরুর দিকে দেখি ‘মিড-ডে মিলের রোজকার জোলো ডালের মতো আকাশে মঙ্গলবারের ডিমের ফ্যাকাসে কুসুমের মতো সূর্য’ একটা প্রকৃতির বর্ণনা উপমা দিয়ে তৈরি হচ্ছে – কেমন উপমা, যে উপমা এই গল্পের সঙ্গে জড়িত, আর তাই আপনার মনের ভিতর সে কাব্যিকভাবে গেঁথে দিচ্ছে অনুভূতি, অবচেতনে, শুধুমাত্র তথ্য বা ঘটনা পরম্পরার সরাসরি বিস্তারে নয়। এখানে অবশ্যই কাব্য বলতে পাঠক আমি লিরিকালিটি বোঝাচ্ছি না, রসিক পাঠক জানেন যে কাব্যিক উপমা এমন ধুরন্ধর বুদ্ধিরও খেলা বটে, যেটা মনস্তাত্ত্বিকের মতো অজ্ঞাতে আপনাকে আমাকে পেড়ে ফেলে – এ গল্পগুলোর কথনও তেমন ব্যাপার। এই গল্প বলার ঢং সাবেকি,  পাঠককে সঙ্গে নিয়ে যেন ছড়িয়ে বসে বলা হচ্ছে গল্পগুলো, কথক যেন সেই বিলাতি তত্ত্বের বিমূর্ত ন্যারেটর নয় বরং এক দেশীয় কথক যার কাছে কবিতা, উপমা, তুলনা, আবেগ, স্বরক্ষেপ এমন অনেক অস্তর রয়েছে পাঠকের জন্য।

    খুব সচেতনভাবে তাই মিথের ব্যবহার করা হয়েছে – প্রত্যেকটা গল্পের চরিত্রের নামে, বা ঘটনায় বা গল্পের নামে কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে রয়েছে মিথ, উপকথা – আর এই মিথের ব্যবহার এক আধুনিক ইন্টেলেকচ্যুয়াল মননের। মিথ, পুরাণ, উপকথা কোনো মিস্টিক বিষয় নয়, আমাদের জীবনের নানা অজানা, লোকায়ত ইতিহাসের শৈল্পিক রূপ বা ক্যাপসুল তাই তাকে শরীরে ধারণ করেছে – কারণ এই গল্প বলার মেজাজের জন্য তা অত্যন্ত জরুরী ছিল। কারণ শিল্পকে শেষ পর্যন্ত সময়ের দলিল হয়ে ওঠা ছাড়িয়ে আরো একটা ভিন্নতর অন্বেষণে যেতে হয়। আধুনিক কবিতায় বেহুলাকে মান্দাসে ভাসালে তা জাদু বাস্তব নয় আবার ইতিহাসও নয়। তা আসলে অতীত ইতিহাস থেকে চোলাই করা অনুভূতির নান্দনিক নির্যাস যার দায় আছে শুধুমাত্র সমসময়ের অবয়বকে প্রাণ দেওয়ার – এই প্রচেষ্টার বাইরে মিথ নিয়ে গল্প ফেঁদে অধুনা কারবারিরা তাকে শুধুমাত্র ইতিহাস বলে চালাতে বা তাকে তথ্য হিসেবে চালাতে যাওয়ার ছেলেমানুষিতে মেতেছেন – এই বইটিতে সেই জোর জবরদস্তি নেই।

    এখানে আখ্যান, উপকথা সবই ইন্টারটেক্সচ্যুয়ালিটির খেলা। যেন হরমোহনের গল্প শুনতে শুনতে বুঝতে পেরে যাই এই গেঁজেল বুড়ো কোথা থেকে আমদানি, আর শ্রীময়ী যে শ্রীরাধার ক্রমবিকাশেরই ধারা তা বুঝেও আহ্লাদ হয়, এই তো ধরতে পেরেছি বেশ – এতে গল্প শোনার রস জমেতাত্ত্বিক পাঠক একে একটা ক্যাথারসিস বলতে পারেন, আমি রসিকের ভাষায় বলব মিলন, এই শ্রীময়ীর দুঃখ, আর আমার দুঃখ আর তার সঙ্গে পদাবলীর রাধা চরিত্রের মানবী দুঃখ মিলে গেল – আমার ত্রস্ত সময় আর গল্পের চরিত্রগুলোর সঙ্গে আবহমানের ত্রাস মিশে গেল – এই অন্ধকারে সেইটা আলোর রেখা, সেটাই একটা শিল্প দিতে পারে, ত্রস্ত সময়ের গল্প তাই এতটা দরকারি আমাদের। রসিক পাঠক এই বইটা তাই আমাদের কাছে দরকারি।       

     


    4thpillars ব্যুরো - এর অন্যান্য লেখা


    কেন্দ্রের শাসক শুধু ভোটের সঙ্গে রোগ সংক্রমণের সম্পর্ক দেখতে পাচ্ছে না!

    ব্যক্তি ট্রাম্প এখানে আলোচ্য বিষয় নন। ট্রাম্প একটা বিকৃত মতবাদের প্রচার এবং প্রসার করছেন মাত্র।

    আলোচনায় বসতে বাধ্য হলেও নতি স্বীকার করছে না সরকার।

    নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে, তারপরেও প্রধানমন্ত্রী কীভাবে রাজ্যের আধিকারিকদের নির্দেশ দিতে পারেন?

    তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময়ে কবির লেখালিখির শুরু। ‘আলোর ফুলকি’-তে প্রথম ছড়া প্রকাশ পায়।

    লকডাউন-এর এই নতুন অধ্যায়ে ‘অবরোধের ডায়েরি’ লিখলেন যশোধরা রায়চৌধুরী

    বাংলার ত্রস্ত নীলিমার ভয়াল সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে-4thpillars

    Subscribe to our notification

    Click to Send Notification button to get the latest news, updates (No email required).

    Not Interested